নির্বাসিতার দিনলিপি ২ | বহ্নিশিখে

 — "পায়ে পড়ি ক্ষিদ্দা, আমি আর পারছি না...."

— "জানি রে জানি কষ্ট হচ্ছে, হাত- পা খুলে খুলে আসছে, কলজে ফেটে যাচ্ছে। যাক যাক, তুই যন্ত্রণা ঠেলে ঠেলে এগিয়ে যা।....  মানুষের ক্ষমতার সীমা নেই রে; সব পারে, মানুষ সব পারে.... ফাইট, কোনি, ফাইট! (কোনি, মতি নন্দী)


মাসখানেক আগে। কলেজ থেকে ফিরে মেঝের ওপর চিৎপাত হয়ে পড়েছি বেহুঁশের মতো।

গত দেড়মাস ধরে রীতিমত ঝড় চলেছে। বাড়ি ছেড়ে থাকার দ্বিতীয় বছরে এসেও মানিয়ে উঠতে পারিনি হস্টেলজীবনের সাথে। কলেজে বিধানসভা নির্বাচনের স্ট্রংরুম পড়ায় অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে। আর ফিজিক্স বা অঙ্ক এমন একটা জিনিস যা স্ক্রিনের ওপারে বসে হয়না। এটা স্যারেরাও মানেন, আমিও মানি। হাতে- কলমে, ফাংশনগুলোর চেহারা না চিনে, সমীকরণগুলোর সাথে যুদ্ধ না করে, শুধু বক্তব্য শুনে আর যাই হোক ফিজিক্স হয় না। 

তবুও পরিস্থিতির চাপে পড়ে mathematical physics এর মূল গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো স্যারকে পড়াতে হয়েছিল অনলাইনেই।

জীবনে ডিজিটাল লার্নিং- এ অভ্যস্ত না হওয়া আমি একবর্ণ বুঝিনি। স্যারকে জানাতে বলেছিলেন, কলেজ খুললে দেখা করতে তাঁর সাথে। কিন্তু খাতাবই বগলে আমি ডিপার্টমেন্টে মুখ দেখালাম বড়ই দেরিতে। তখন অলরেডি দুটো ইন্টারনাল শেষ হয়ে, ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে সেমিস্টার। 

হাজির হয়েছিলাম স্পেশাল ফাংশনের কিছু সমস্যা নিয়ে। কিন্তু আসল সমস্যা ধরতে এক মিনিটও লাগেনি স্যারের। আমার বিশাল গলতি থেকে গেছে একেবারে বেসিক সমীকরণগুলোতেই!

সেদিন পুরো স্টাফরুমের সামনে দাঁড়িয়ে বকুনি শুনেছিলাম মাথা নিচু করে। হাতের মুঠোয় জামা চেপে ধরে কাঁপছি থরথর করে, মাথার মধ্যে ছুরির মতো কেটে বসছে, "পারলাম না।.... পারলাম না এত চেষ্টা করেও!"

ঘাড়ে বই বোঝাই ভারী ব্যাগ নিয়ে, মে মাসের ভ্যাপসা গরমে এক কিলোমিটার হেঁটে ফিরেই এলিয়ে পড়েছিলাম মেঝের ওপর। উঠে বসার মতোও শক্তিটুকু নেই আর, শারীরিক- মানসিক দুই ক্লান্তিই চেপে বসছে সারাদিনের পর। কেউ জানবে না, গত একমাস ধরে ঠিক কী গেছে আমার ওপর দিয়ে! এত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও, ঠিক কতখানি চেষ্টা করেছি জিনিসগুলো শিখতে, একটু আয়ত্তে আনতে ওদের! "যত খুশি বকুন স্যার, জানি আজ এটাই প্রাপ্য আমার.... কিন্তু বিশ্বাস করুন এতদিন সত্যিই চেষ্টা করছি আমি, আজ আর পারছি না, সত্যি পারছি না আর....."

জানি না কেন, সেই প্রায় বেহুঁশ অবস্থায় মনে ভেসে এসেছিল 'কোনি' উপন্যাসের ওই লাইন কটি।

স্যার ডেকেছিলেন পরদিনই। না, স্পেশাল ফাংশন নয়, প্রাথমিক সমীকরণগুলোই মেরামত করলেন ঘন্টাখানেক ধরে। পরে লাইব্রেরিতে বসে, নিজের হাতে সব- কটা ফাংশন কষেছিলাম একাই, বাড়ি ফিরে বইয়ের সাথে মেলাতে গিয়ে শুধুই মনে হচ্ছিল..... "আমি পেরেছি স্যার, সত্যিই পেরেছি আমি, এতদিন পরে হলেও পেরেছি!"

পুরো অনার্সের নিরিখে বাদই দিলাম, হয়তো পুরো সেমিস্টারেও জিনিসগুলো অল্পই কাজে লাগবে। ভবিষ্যতে হয়তো আরো কঠিন, আরো বড় বড় সব থিওরি শিখব। কিন্তু চিরকাল হয়তো মনে থেকে যাবে একটা শতাব্দীপ্রাচীন ল্যাবে বসে এক ঋষিতুল্য মানুষের কথা।

যিনি গোড়ায় গলদ দেখেও অঙ্কটা আগাগোড়া কষে দেননি কোনদিনই, পরীক্ষার কিছুদিন আগে পর্যন্তও শিখিয়েছেন হাতে ধরে। "নিজের হাতে কর, চেষ্টা কর, সমস্যা হলে আমি আছি সবসময়ই!"


© All Rights Reserved.

Comments

Popular posts from this blog

HELLO! WELCOME

Bengali works | তোমার দুটি পায়

Black Pit of Darkness | The Dark Truth