নির্বাসিতার দিনলিপি ১ | ছিন্নপত্র

ঘড়িতে ক- টা বাজে এখন?

ক্যালেন্ডারেই বা কত তারিখ।

থাকগে, সব হিসেব গুলিয়ে গেছে আজকাল। মোটামুটি, আর হাতে গোনা কিছু দিন পরেই, ফের তোমায় শান্তিতে ছেড়ে দিয়ে পাড়ি দেব কোন অজানার উদ্দেশ্যে….

সত্যি তোমাকে বড্ড জ্বালাই, না মা? তোমাকে সত্যিই কখনো শান্তি দিইনি, আনন্দ দিতে পারিনি, সুখে রাখতে পারিনি, তাই না? হাসি ফোটাতে পারিনি তোমার মুখে, ঐ সব সোনার টুকরো ছেলেমেয়েগুলোর মতো….

তোমার মনে পড়ে মা, ছোটবেলায় পথেঘাটে, স্কুলের বাইরে, পার্কে, স্টেশনে, ট্রেনে- বাসে কত বাচ্চাদের সাথে তাদের মাকে দেখেছি, কী সুন্দর হাসত সবাই। তোমায় জিজ্ঞেস করতাম, তুমি এমনি করে হাসো না কেন? বলতে, আমি যদি পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি নম্বর পাই, ক্লাসে ফার্স্ট হই, তবে ঐরকম করে হাসবে, আরও সুন্দর করে। আমিও পড়তাম, পরীক্ষা দিতাম, রেজাল্ট আনতাম, সবার উপরে —। পরপর তিন- চার বছর সবার উপরেই ছিলাম মা, তবুও মনে পড়ে না অমনি করে কোনদিন হেসেছ বলে। হয়তো হাসতে, আড়ালে আড়ালে…. বাবা বলেছিল। আর সেই কথাটাকেই ভীষণভাবে বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম, জানো।

তারপর ক্লাস উঁচু হল। পড়াশোনা পালটাল। বাড়ল জীবনের জটিলতাও। তুমি বুঝতে, সবই বুঝতে, তবু কেন যে হাসির ওপর ওই অসহ্য মূল্যটা চাপিয়ে রেখেছিলে, কে জানে! বলতে, অমুককে হারালেই আমি হাসব —। আমি সত্যি ভীষণ চেষ্টা করতাম, জানো। কোনদিন হয়তো ক্লাসে পড়া দেবার সময় অমুকের চেয়ে ভালো বলেছি, কোনদিন আমার লেখাটা অমুকের টার চেয়েও বেশি প্রশংসা পেয়েছে দিদিমণির কাছে, কোনদিন হয়তো স্পিচ বা কুইজ কনটেস্টে পাঠানোর জন্য অমুকের আগে আমার নাম এসেছে, কোনদিন সায়েন্স মডেল বানানোর সময় অমুকের চেয়ে আমার আইডিয়াটা বেশি মনে ধরেছে সবার— ভীষণ খুশি হয়ে যেতাম সেসব দিনে, বিশ্বাস করো। ভাবতাম এতদিনে তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি। এতদিনে তুমি হাসবে, ভেবে আকর্ণ হাসতাম… অথচ কোনদিনই হাসোনি তুমি। এসব ছোটখাট ব্যাপারে তোমার মন ভরত না, সবসময়ই কোন না কোন পরীক্ষার দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে…

পারতাম না আমি। হেরে যেতাম। শত, সহস্র, লক্ষ জটিলতার কাছে হেরে যেতাম। বড্ড কষ্ট হত, বিশ্বাস করো, ভীষণ কষ্ট পেতাম। আড়ালে কাঁদতাম, তোমাকে লুকিয়ে, যাতে তুমি আর বেশি কষ্ট না পাও। অথচ কী আশ্চর্য নির্লিপ্ত থাকতে তুমি। কী অবলীলায় বলে দিতে, যেখানে কোন পক্ষপাতিত্ব কাজ করবে না, সেসব পরীক্ষাকেই পাখির চোখ করার জন্য ….

ভুল ভেঙেছিল তোমার। পরপর। তোমার বিশ্বাসে ভর করে চলা আমারও। ভয়ঙ্কর কষ্ট পেয়েছিলাম সেসব দিনে, বিশ্বাস করো। তুমিও পেয়েছিলে নিশ্চয়ই। অথচ তোমাকে দেখে কিচ্ছু বোঝার উপায় থাকত না! কী অদ্ভুত নিস্পৃহ, নির্লিপ্ত! আমি হাসলেও যেমন উদাসীন থেকেছিলে, আমি কাঁদলেও তেমনিই থেকে গেলে! ঠিক যেন বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা সাক্ষাৎ পাষাণী!

অতীত ছাড়ল না আমাকে। বলা ভালো, তুমি অতীতকে ছাড়তে দিলে না। অমুকের আর আমার জীবনের পথ আলাদা হয়ে গেলেও ধরে বসলে, ওকে হারাতেই হবে আমাকে। এমন কিছু করতে হবে, যাতে অমুকদের সবার চোখ ট্যারা হয়ে যায়। বহুদিন চেষ্টা করেছিলাম জানো, বুকের শেষ রক্তবিন্দুটুকুও নিংড়ে চেষ্টা করে গেছিলাম। কিন্তু জীবনের ইচ্ছা ছিল না। ফের হেরে গেলাম। ফের পারলাম না। পারলাম না তোমার মুখে হাসি ফোটাতে….

উফ, এত কান্না কোথায় থাকে? ভাগ্যিস মোবাইলে টাইপ করছি, খাতায় লিখলে কাগজ ভিজে লেখার দফারফা হয়ে যেত এতক্ষণে। মা, মা গো, তোমাকে হাসাতে না পেরে নিজেও যে হাসতে ভুলে গেছিলাম আমি! চিরকাল যা চেয়ে এসেছি, অন্তরের একদম গভীর থেকে, তার কাছাকাছি এসেও যে হাসতে পারি না গো, তুমি হাসবে না বলে! যখন কাঁদি না, বা কাঁদতেও ভুলে গিয়ে রক্তাক্ত হই না; তখন আশেপাশে ঘিরে থাকা আলোগুলো আমার ক্ষতগুলোতে প্রলেপ বুলিয়ে দেয়, অনাবিল এক শান্তিতে ঢেকে দেয় আমাকে, কিন্তু হাসাতে পারে না আর!

তোমার মনে আছে, হস্টেলবাসকে নির্বাসন বলতাম আমি? একদিন ডায়েরিতে লিখেছিলাম, বাড়িতেও যে কী অনির্বাসনে থাকি বুঝি না! সত্যি গো, হস্টেলে থাকতে ঘুম ভেঙে উঠে তোমাকে পাশে না পেয়ে যে কান্নায় বুক ভেঙে আসত, তবু বাড়িতে থেকেও সেই শূন্যতা কী পূরণ হয়েছে কোনদিন? এখন বুঝি, বাইরে থাকতে গিয়ে যদি মনখারাপ হয় তা বাড়ির জন্য নয়। তোমার জন্যও নয়, সেই বাচ্চা মেয়েটার জন্য; যে হাসত এটুকু বিশ্বাস করে যে তুমি হেসেছো, আড়ালে হলেও হেসেছো!

প্রথমে ছিল স্কুল। এখন কলেজ। এইভাবেই ছোট ছোট আশ্রয়গুলোকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইব আমি …

আবার কালের নিয়মে সরেও যাবে সব ….

তবু এ নির্বাসন কাটবে না কোনদিন। 

যতদিন না তোমার মুখে হাসি ফোটাতে পারছি; বা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে পারছি যে পেরেছি হাসি ফোটাতে!


*****


যখন তুমি এ চিঠি পড়বে মা, আমি আর তোমার কাছে থাকব না। ফিরে আসার আশা হয়তো থাকবে, হয়তো থাকবে না। একটাই অনুরোধ মা গো, আমি যেখানেই থাকি, পৃথিবীর বুকে বা ওই দূর আকাশের বুকে, একবারটি হলেও হেসো আমার জন্য!

আমি যেখানেই থাকি মা, ঠিক দেখতে পাব। আর সেইদিনই আমি হাসব, সত্যিকারের হাসব, জীবনে প্রথমবার!!


© All Rights Reserved. 

Comments

Popular posts from this blog

HELLO! WELCOME

Bengali works | তোমার দুটি পায়

Black Pit of Darkness | The Dark Truth